ফেনীতে পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। ক্রেতা না থাকায় বেশির ভাগ ছাগলের চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। মৌসুমী ক্রেতারা কেনা দামেও চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সরকারিভাবে কোরবানির পশুর দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পরও সেই দামে ফেনীতে বিক্রি না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ঈদে গবাদিপশুর মালিক ও মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা।
ঈদের দিন রোববার বিকেল থেকে ঈদের পর দিন সোমবার বিকেলে পর্যন্ত ফেনী জেলার চামড়ার আড়ৎ পাঁচগাছিয়া চামড়া বাজার, শহরের ট্রাংক রোড ও রেলগেইট এলাকার অস্থায়ী বাজার ঘুরে ও বিভিন্ন উপজেলার চামড়া ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, দাম কম পাওয়ায় গত বছরের মতো এবারও ফেনীতে কোরবানির পশুর চামড়ার দামে ধস নামে। শহরে ও গ্রামে এলাকাভেদে গরু ও মহিষের ছোট-বড় সব ধরনের চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। কোন কোন এলাকায় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীর দেখা না পেয়ে কোরবানি পশুর ৯৫ শতাংশ চামড়া স্থানীয় মাদরাসা ও এতিমখানায় দান হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়েছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বলেও জানা গেছে।
পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান ভুট্টো বলেন, আড়াই লাখ টাকা দিয়ে কেনা তার মহিষের চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ১০০ টাকায়।
ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি তার সোয়া লাখ টাকার গরুর চামড়া মাত্র ১৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন।
ফেনী শহরের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা জোহরা হক জানান, রোববার দুপুর পর্যন্ত গরুর চামড়ার ক্রেতা না পেয়ে বিকেলে স্থানীয় মাদরাসাকে দান করে দেওয়া হয়েছে।
সোনাগাজীর বগাদানা গ্রামের সারওয়ার হোসেন বলেন, ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কেনা ছাগলের চামড়া ঈদের দিন বিকেল পর্যন্ত কেউ কিনে না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে তিনি মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। তার মতো জেলায় অনেকে ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বা কোরবানির বর্জ্যর সাথে ফেলে দিয়েছেন।
ফেনী শহরের ট্রাংক রোডে আবদুল কাদের নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ীকে রোববার রাতে ১০টার দিকে ৫টি চামড়া নিয়ে বসে থাকতে দেখে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, শহরের দাউদপুর ও রামপুর এলাকা থেকে তিনি চামড়াগুলো গড়ে ৩০০ টাকা করে কিনেছেন। নিজের খরচ ও রিকশা ভাড়া দিয়েছে বিক্রির জন্য এনেছেন। চামড়া ব্যাপারীরা ১৫০ টাকা বলে চলে গেছেন।
রাত ১১টা পর্যন্ত ক্রেতা না পেয়ে তিনি ক্ষোভে চামড়া সড়কে ফেলে বাড়ি চলে যান।
দাগনভূঞার সিলোনীয়া বাজারের ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী মো. রানা গ্রামে হেঁটে গড়ে ২০০ টাকা করে ২২টি চামড়া কিনে কয়েক’শ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে বাজারে নিয়ে ৩০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন।
শহরের শান্তি কোম্পানী রোডের ইসলামিয়া এতিমখানার সভাপতি কেবিএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাদের এতিমখানায় পাওয়া ২৬৭টি ছোট-বড় চামড়া গড়ে ৩৭০ টাকা বিক্রি করেছেন। তারা কোনো ছাগলের চামড়া সংগ্রহ করেন নি।
শহরের অপর আরেকটি মাদরাসা তত্ত্ববাবধায়ক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, গরু ও মহিষের ৩৭০টি চামড়া সংগ্রহ করে পাঁচগাছিয়া আড়ৎ এ নিয়ে গেলে গড়ে ৩৩০ টাকা দরে দাম পেয়েছেন।
ফেনীর পাঁচগাছিয়া চামড়া আড়ৎ’র সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন বলেন, তিনি এ বছর গড়ে ৩৫০-৪৫০ টাকায় ১০ হাজার গরু-মহিষের চামড়া ক্রয় করেছেন।
অপর আড়ৎদার মো. নুর নবী জানান, এবার ঢাকা থেকে তারা চামড়ার কোনো নির্দিষ্ট দর পাননি। তা ছাড়া ঢাকায় ট্যানারিতে বা বড় আড়ৎ এ চামড়া বিক্রি করে বকেয়া প্রায় কোটি টাকা বিগত পাঁচ বছরেও আদায় করা যায় নি।
ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহবুবল হক জানান, একসময় জেলায় একমাত্র তার ইউনিয়নের পাঁচগাছিয়া বাজারে চামড়ার ছোট বড় ৫৫ থেকে ৬০ জন আড়ৎদার ছিলেন। বছরের পর বছর লোকসানের কারণে অনেকেই ব্যবসায় গুটিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে মাত্র ব্যাংক লোন ও ধারদেনা করে ১৪-১৫ জন আড়ৎদার টিকে রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ঈদের পূর্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪৭ থেকে ৫২ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৪ টাকা; সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং ছাগলের চামড়ার দর প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে ফেনীতে এ দামে গরু, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া কেনাবেচা হয়নি।












