স্কুলছাত্রকে হত্যার পরও ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায় ঘাতকরা

দশম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল ইসলামকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর কালীগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। আর হত্যার পর মুক্তিপণ নাটক সাজিয়ে প্রবাসে থাকা বাবা মোহাম্মদ আলীর কাছে ছেলের মোবাইল ফোন থেকে ইন্টারনেট প্রযুক্তি ইমু ব্যবহার করে চাওয়া হয় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ। অভিনব কায়দায় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাফাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল ইসলাম (১৬)কে অপহরণের পর ঘাতকরা হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে সদর উপজেলার কাফাটিয়া গ্রামের ইব্রাহিম ও সিংগাইরের জামসা গ্রামের কলেজছাত্র আরিফকে আটক করার পর শনিবার রাতে মানিকগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে দেয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে। কিলিং মিশনে মোট চার জন অংশ নেয়। দেড় মাস আগে অপহরণের পরই ঘাতকরা রাতেই একটি বাঁশঝাড়ের তলায় নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ওই ছাত্রের লাশ কালীগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) হানিফ সরকার জানান, গত ৬ই আগস্ট বিকালে আশরাফুল ইসলাম মোটরসাইকেল নিয়ে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় পর দিন আশরাফুলের দাদা নাজিম উদ্দিন মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে জিডিটি মামলা আকারে রেকর্ড করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিখোঁজ স্কুলছাত্রের সহপাঠীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। ২৫শে আগস্ট আশরাফুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় সিংগাইরের আজিমপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ওই মোবাইলের সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবার ভোরে সদর উপজেলার কাফাটিয়া গ্রামের মনোয়ার হোসেনের ছেলে ইব্রাহিম হোসেন (২৪) ও সিংগাইর উপজেলার উত্তর জামশা গ্রামের আবুল হাশেমের কলেজ পড়ুয়া ছেলে আরিফ হোসেন (২৩)কে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্রবার তাদের দেয়া তথ্য মোতাবেক নিখোঁজ আশরাফুলের মরদেহ উদ্ধারের জন্য উত্তর জামশা এলাকায় কালিগঙ্গা নদীতে ডুবুরি দিয়ে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) হানিফ সরকার জানান, আশরাফুলের বাবা মোহাম্মদ আলী একজন প্রবাসী। অপহরণকারীদের টার্গেট ছিল যেহেতু তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাস যাপন করছেন ছেলেকে অপহরণ করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা যাবে। এ কারণেই ছেলেকে হত্যা করার পরও মুক্তিপণ নাটক সাজিয়ে প্রবাসে থাকা বাবা মোহাম্মদ আলীর কাছে ছেলের মোবাইল থেকে ইন্টারেনেট প্রযুক্তি ইমুর ব্যবহার করে চাওয়া হয় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ।
যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়: গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশ ও আদালতকে জানিয়েছেন ঘটনার দিন গত ৬ই আগস্ট স্কুলছাত্র আশরাফুল তার ব্যবহৃত ১৫০ সিসি সুজুকি কালো রঙের মোটরসাইকেল নিয়ে আসামি ইব্রাহিম হোসেনের বাড়ি সিংগাইর উপজেলার উত্তর জামশা যায়। সেখানে আশরাফুলসহ চার আসামি উত্তর জামশা গ্রামে আলমের বাড়িতে মাদক সেবন করে। এরপর রাত ঘনিয়ে আসলে আশরাফুলকে ইউনুসের বাঁশঝাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আসামিরা আশরাফুলকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে লাশ পাশের কালিগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। ওই রাতেই আশরাফুলের মোবাইল ফোন থেকেই খুনিরা ইমু ব্যবহার করে তার প্রবাসী পিতা মোহাম্মদ আলীর কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ও বিভিন্ন বিকাশের নম্বর দিয়ে টাকা পাঠানোর জন্য বলে। ঘটনার কয়েকদিন পর আশরাফুলের সুজুকি মোটরসাইকেলটি রাজবাড়ী জেলার সাজ্জাদ হোসেনের কাছে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে ওই টাকা আসামিরা ভাগ করে নেয়। আশরাফুলের ওই মোটরসাইকেলটি শুক্রবার সিলেট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে চারজন আসামির মধ্যে একজন সম্প্রতি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। শনিবার বিকাল ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মানিকগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে দুই আসামি আশরাফুলকে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

SHARE