সাংবাদিক ফাগুন হত্যা ॥ ভয় থেকেই কী বেওয়ারিশ?

সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা, ফাগুন। যার পরিচিতি ছিলো ফাগুন রেজা নামেই। মাত্র বিশ বছর বয়সেই নিজ যোগ্যতায় যোগ দিয়েছিলেন ঢাকার অন্যতম একটি নিউজ পোর্টালের ইংরেজি বিভাগে সাব-এডিটর হিসাবে। অতি অল্পসময়েই তিনি পরিণত হয়েছিলেন ঢাকার গণমাধ্যম জগতের প্রিয়মুখে। গত ২১ মে ঢাকা থেকে শেরপুর আসার পথে নিখোঁজ হন তিনি। পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায় জামালপুর নান্দিনার মাঝামাঝি জায়গায় রেললাইনের ধারে। ২১ আগস্ট ফাগুন রেজা নিহত হবার ৩ মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত তার খুনের রহস্য অজানাই রয়ে গেছে। সাংবাদিক ইহসান ইবরে রেজা ফাগুন এর স্মৃতিরচারণ করেছেন অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার, সাবেক সভাপতি শেরপুর প্রেসক্লাব।

সাংবাদিক ফাগুন হত্যা ॥ ভয় থেকেই কী বেওয়ারিশ?

রফিকুল ইসলাম আধার :

’যে কাজ করতে গেলে আমাকে কম্প্রোমাইস করতে হবে, সেই কাজ আমি কেন করবো? করলে ভালভাবে করবো, না হলে করবো না। ওই প্রতিষ্ঠানেই কাজ করবো না।’ কোন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নীতির প্রশ্নে আপোষ না করার এমন দৃঢ় অবস্থান কোন সাহসী ও বয়সী বা পরিপক্ক মানুষেরই হওয়ার কথা। কিন্তু এ কথা কোন বয়সী মানুষের নয়, তরুণ প্রজন্মের এক স্বাধীনচেতা সাহসী নবীন সাংবাদিকের, ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের। যে দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। অনলাইন নিউজপোর্টাল প্রিয় ডটকমে ক’মাস আগে নিজের প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে ঘিরে ক্ষুব্ধ পক্ষের হুমকির মুখে কর্তৃপক্ষের অবস্থানের প্রেক্ষিতে এক অগ্রজ সহকর্মীর সাথে কথোপকথনে উঠে এসেছিল তার ওই দৃঢ় অবস্থানের কথা। পরে অবশ্য তার অবস্থান ও সাহসিকতাই জয়ী হয়েছিলো। ক্ষমা চেয়ে পিছু হটেছিলো ক্ষুব্ধ পক্ষ। আর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিলো তার কর্তৃপক্ষকে।
শেরপুরের এক সুপরিচিত সাংবাদিক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন। সে ছিলো জেলার প্রথম সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক শেরপুর’ এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, বিশিষ্ট কবি প্রয়াত আব্দুর রেজ্জাকের দৌহিত্র এবং ‘সাপ্তাহিক শেরপুর’ এর বর্তমান সম্পাদক, প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক কাকন রেজার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও অনলাইন নিউজপোর্টাল প্রিয় ডটকমের সদ্য সাবেক সহ-সম্পাদক। দাদার নীতি-আদর্শের ধারাবাহিকতায় অনেকটা নীরবেই পিতার হাত ধরে বেড়ে উঠা ফাগুন তেজগাঁও কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। মেধাবী, টগবগে এ তরুণ অধ্যয়নরত থাকার পরও সাংবাদিকতার নেশা তাকে পেয়ে বসেছিল পারিবারিক সূত্রেই। প্রিয় ডটকমে সুনামের সাথে ইংরেজি ভার্সনে দায়িত্ব পালনের পরও কিছুদিন আগে তা ছেড়ে দিয়ে ২১ মে অনলাইন নিউজপোর্টাল জাগো নিউজে সাক্ষাৎকার দিয়ে উত্তীর্ণও হয়েছিলো। কথা ছিল কয়েকদিন পর সেখানে যোগ দেওয়ার। আর সাক্ষাৎকার শেষ করে সেদিনই বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওনা হলেও বাড়ি ফেরা হয়নি তার। পরদিন সকালে জামালপুরের নান্দিনা রানাগাছা এলাকায় রেললাইনের পাশে পাওয়া যায় তার লাশ।
ফাগুনের ওই মর্মান্তিক সংবাদ শেরপুরে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন ফাগুনের পিতার সহকর্মী গণমাধ্যম কর্মীরাসহ শহরের সচেতন মহল। তবে আমার হতবাক হওয়াটা ছিল অনেকটা ওষ্ঠাগত। কারণ অগ্রজ কবি-সাংবাদিক কাকন রেজার ঘরে ফাগুন এতোটা বেড়ে উঠেছে এবং সে পারিবারিক সূত্রে অধ্যাবসায়কালেই সাংবাদিকতায় পা দিয়ে একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে সাব-এডিটর হিসেবে ইংরেজি ভার্সনে কাজ করছে-এমনটা জানা ছিলো না। এক্ষেত্রে যন্ত্রচালিতের মতো ব্যস্তময় জীবনের পাশাপাশি হয়তোবা অন্য দু’চার জনের মতো আত্মভোলা হওয়ার কারণেই একই শহরে থেকেও জানা হয়নি তাকে। তবে এক পলক চোখ বুজে স্মরণে আনতে কষ্ট হয়নি মোটেও। পরক্ষণেই ঝলমল হয়ে ভেসে উঠেছে আমার সাহিত্য ও সাংবাদিকতার চারণক্ষেত্র ‘সাপ্তাহিক শেরপুর’ পরিবারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার সুবাদে ১০/১২ বছর আগে দেখা দাদু পাগল ফাগুনের ছবি। কেবল আদর-সোহাগের ভাগাভাগি নয়, কোলে-পিঠে নেওয়ার বিষয়টিও নেহায়েত কম ছিল না। যাই হোক, স্বজনের ওই মর্মান্তিক বিয়োগাত্মক ঘটনায় শরীর যেন দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো। পরক্ষণেই সদ্য গণমাধ্যম জগতে পা রাখা নিজের সন্তান মইনুল হোসেন প্লাবনের কথা মনে পড়ে আত্মজ অনুভূতিটা পাথুরে নিস্তব্ধ ও হিমশীতল হয়ে পড়লো। ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে রেললাইনের পাশ থেকে সাংবাদিক পুত্র ফাগুনের লাশ উদ্ধারের খবর।
যতটুকু জানা যায়, ২১ মে রাতের ট্রেনে শেরপুরের উদ্দেশ্যে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুরে ফিরছিলেন ফাগুন। সর্বশেষ রাত পৌণে ৮টার দিকে বাবা কাকন রেজার সাথে যখন কথা হয়, তখন সে জানিয়েছিলো ময়মনসিংহের কাছাকাছি আছে। কিন্তু এরপর থেকেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। চিন্তায় বিষন্ন হয়ে পড়ে পরিবার। শুরু হয় রাত থেকেই ছুটোছুটি। ২২ মে সকালে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানায় একটি জিডিও করা হয়। এরপর পুলিশের মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে ফাগুনের অবস্থান পাওয়া যায় ময়মনসিংহের একটি গ্রামে। যেখানটা পরিবারের কারোরই পরিচিত নয়। অবশেষে ওইদিন বিকেলে অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সন্ধান পাওয়ার কথা শুনে ফাগুনের লাশ শনাক্ত করেন পিতা।
কিন্তু লাশ উদ্ধার এবং তার পরিচয় শনাক্তকরণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়েই দ্রুত ময়নাতদন্ত সেরে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তড়িঘড়ি কবর খুড়ে দাফনের প্রস্তুতির ঘটনা আরও বেদনাদায়ক। কারণ রেল পুলিশের ভাষ্যই বলছে, ‘নান্দিনা এলাকায় রেললাইনের পাশে এক তরুণকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে গ্রামবাসী। এরপর নিস্তেজ থাকা সেই তরুণের মাথায় পানি ঢেলে তার সম্বিৎ ফেরানোর চেষ্টা চলার কিছুক্ষণ পরই সে প্রাণ হারায়’। ফাগুনের মাথায় ও গলায় জখমের চিহ্ন থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেটা হতে পারে আঘাতে হত্যার পর অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্ত-ছিনতাইকারী চক্রের কাধে দোষ চাপাতে সাথে থাকা ল্যাপটপ, মোবাইল ও মানিব্যাগ সরিয়ে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে কিংবা দুর্বৃত্ত চক্র সেগুলো ছিনিয়ে নিতেই তাকে আঘাতে ও ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। অথচ ওই ঘটনায় জিআরপি থানায় নেওয়া হয় একটি অপমৃত্যু মামলা। এক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই প্রশ্নের উদ্রেক হয় আহত অবস্থায় অজ্ঞাতনামা তরুণকে স্থানীয়দের হাতে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পরও কেন নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকলো রেলওয়ে পুলিশ। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা না করে কেনই বা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হলো? এমন টগবগে পরিচ্ছন্ন তরুণকে ওই অবস্থায় পাওয়ার পরও তাদের কেন এ অবহেলা? কেনই বা সেই অজ্ঞাতনামা তরুণ প্রাণ হারানোর পর তার পরিচয় শনাক্তকরণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে দ্রুত ময়নাতদন্ত সেরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে তার লাশ হস্তান্তর করে তড়িঘড়ি কবর খুড়ে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়? মাথা ও গলায় আঘাতের চিহ্ন পাবার পরও কেনই বা সেটাকে নেহায়েত দুর্ঘটনা ভেবে নিয়ে অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়? ট্রেন থেকে ফেলে দিলে কি শুধু মাথা ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও জখম পাওয়ার কথা নয়? আর সেটা হয়েও থাকলে রেলযাত্রীদের কেউ কি জানবে না? জানবে না রেলের দায়িত্বে থাকা অন্য কেউ? অবস্থাদৃষ্টে ফাগুন ততক্ষণ পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা হলেও সে বিষয়ে হত্যা মামলা নিতে বাঁধা বা অসুবিধাটা কোথায় ছিলো? তাদের ওই ধরনের ভূমিকা কি কোন যোগসূত্রের বহিঃপ্রকাশ? একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফাগুনের করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনই কি সেই যোগসূত্র স্থাপন করেছিলো? নাকি রেল লাইন কানেকশনে থাকা কোন দুর্বৃত্তায়নের সিন্ডিকেটকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই পরিচয় ফাঁস হলে ফেঁসে যাবার ভয় থেকেই ফাগুনকে করা হয়েছিলো বেওয়ারিশ? মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফাগুন বেঁচে গেলে সব ফাঁস হয়ে যাবার ভয় কি পেয়ে বসেছিলো? যদিও রেলওয়ে পুলিশের দাবি জামালপুর সদর হাসপাতালে লাশ সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটর না থাকায় লাশ ফুলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কায় ময়নাতদন্ত করানো হয়েছে এবং পিবিআইয়ের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দাবিটি অনেকটা দায়সারা গোছের বলেই তাদের প্রতি তীর্যক প্রশ্ন দিনের পর দিন আরও বাড়তেই থাকবে, যতক্ষণ না ফাগুনের হত্যা রহস্য উদঘাটিত না হবে। আর ওই রহস্য উদঘাটনে সন্দেহের চোখে থাকা রেলওয়ে পুলিশকেই হতে হবে দায়িত্বশীল। তাদের নিজেদেরকেই প্রমাণ করতে হবে ফাগুন হত্যার সাথে যে চক্রই জড়িত থাকুক না কেন, তার সাথে তাদের কোন যোগসূত্র নেই।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২৫ মে ফাগুন হত্যায় তার বাবা বাদী হয়ে জামালপুর জিআরপি থানায় একটি হত্যা মামলা দিয়েছেন। আর সেই পিতার সন্তান হত্যার বিচার দাবিতে জামালপুর ও শেরপুরের গণমাধ্যম কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে থেকে আন্দোলনে নেমেছেন। তাই ফাগুনের বাবাসহ পরিবারের ক্ষত-বিক্ষত সদস্যদের মতো আমাদেরও চাওয়া, দ্রুত ফাগুন হত্যার রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক। ফাগুন হত্যার সুষ্ঠু ও উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত কর হোকা। ততক্ষণই আমাদের অপেক্ষা। তবে দীর্ঘ তদন্তের নামে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার মতো ফাগুন হত্যাও যেন তিমিরে হারিয়ে না যায়, তদন্ত কর্তৃপক্ষ যেন প্রভাবমুক্ত হয়ে সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলকে। সুতরাং পূর্বাপর অবস্থা বিবেচনায় দায়িত্বশীল মহল আর তদন্ত কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতায় ফাগুনের মতো একজন উজ্জল সম্ভাবনাময় কলমসৈনিক হত্যার দ্রুত ন্যায়বিচার হোক- এটাই সময়ের দাবি।

লেখক : সাবেক সভাপতি, শেরপুর প্রেসক্লাব।