‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’

ভিন্ন এক পরিবেশে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হলো ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান। হজযাত্রীরা সফেদ দু’ টুকরো কাপড়ে নিজেকে আবৃত করে একই সুরে উচ্চারণ করলেন- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক। লা শারিকা লাক্‌’। অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।
গতকাল ছিল পবিত্র আরাফাত দিবস। এদিন মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এই আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে দিয়েছিলেন বিদায় হজের ভাষণ। সেই স্মৃতিকে বুকে জড়িয়ে হজযাত্রীরা আল্লাহর সান্নিধ্য প্রার্থনা করেছেন।

বিশ্ব মানবতার জন্য দোয়া করেছেন। সারাটা দিন প্রার্থনায় মশগুল ছিলেন। এ দিনটিকে মূল হজ বলে ধরা হয়। করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এবারের হজ পালিত হচ্ছে সীমিত পরিসরে। হজযাত্রীদের মুখে পরতে হয়েছে মাস্ক। রক্ষা করতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। তারা লাইন ধরে গতকাল ভোর থেকে লাব্বাইক ধ্বনিতে আরাফাতের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকেন। পথে পথে দেখা যায় তাদেরকে বিভিন্ন রকম নির্দেশনা দিচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা ও সমাজসেবকরা। কোনো জটলা নেই। কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই। শান্তভাবে হজ পালন করছেন হজযাত্রীরা। আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে গতকাল হজের খুতবা পাঠ করেন শায়ক আবদুল্লাহ বিন সুলাইমান আল মানিয়া। ২৮শে জুলাই সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এক রাজকীয় ফরমানে তাকে এ বছর নিয়োগ দিয়েছেন। ৮৯ বছর বয়সী শায়খ আবদুল্লাহ বিন সুলাইমান আল মানিয়া আইনজ্ঞ হিসেবে বেশ প্রসিদ্ধ। তিনি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন বা ওআইসি’র ইসলামিক ফিকাহ একাডেমির সদস্য। এর আগে তিনি মক্কা আল মোকাররামা কোর্টের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি খুতবায় মুসলিম জাতিকে ইসলামে দেখানো পথের নির্দেশনা দেন। তুলে ধরেন কোরবানির মাহাত্ম্য। আল্লাহকে পাওয়ার পথ দেখান। খুতবা শেষে জোহরের আজান হয়। একই আজানে দুই ইকামতে জোহর ও আসরের কসর দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন হজযাত্রীরা।
এ ছাড়া পুরোটা দিন তারা আরাফাতের ময়দানে ইবাদত বন্দেগিতে অতিবাহিত করেন। এখানে কোনো জাতি, বর্ণ, গোত্র ভেদাভেদ নেই। সবাই এক আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে উচ্চারণ করেন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। এখান থেকে সূর্যাস্তের পর হজযাত্রীরা ছুটে যান মুজদালিফায়। সেখানে হজযাত্রীরা মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন। মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে সারারাত অবস্থানের পর আজ ভোরে ফিরে যাবেন মিনায়। জামারায় শয়তানকে নিক্ষেপ করবেন পাথর। পবিত্র কাবা তাওয়াফ করবেন। তবে নতুন রূপে তারা এবার কাবা’কে দেখতে পাবেন। চারদিক থেকে বেষ্টন দেয়া। তারা স্পর্শ করতে পারবেন না পবিত্র কাবা ঘরকে। স্পর্শ করতে পারবেন না হজরে আসওয়াদকে।
মক্কায় গ্রান্ড মসজিদ থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে পবিত্র মিনা উপত্যকা। বুধবার এই উপত্যকা পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ তাঁবুর শহরে। এই মিনায় আছে প্রায় ২৫ লাখ হজযাত্রী অবস্থানের মতো স্থান সংকুলান। তবে এবার করোনা মহামারির কারণে হজযাত্রীর সংখ্যা এক হাজারের নিচে রাখা হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় হজ করার সুযোগ পেয়েছেন সৌদি আরবের নাগরিক এবং সৌদি আরবে বসবাসকারী বিদেশি মুসলিমরা। সৌদি আরবের বাইরে থেকে কোনো বিদেশি মুসলিম গিয়ে এবার হজ করতে পারছেন না। হজযাত্রীদের সেবায় নেয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। তাদের শরীরের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। তারা পবিত্র মক্কায় পৌঁছার পর পরই কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়েছিল। তাদের লাগেজ স্যানিটাইজড করেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক স্টাফরা পবিত্র কাবা শরীফের চারপাশ জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করেছেন। কাবা শরীফকে স্বর্ণখচিত কালো গিলাফে আবৃত করা হয়েছে।