বিজ্ঞানীদের সতর্কতা উপেক্ষা করেছে ভারত সরকার, ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত ৪ লাখের বেশি

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কতাকে উপেক্ষা করেছে ভারত সরকার। সরকারের গঠন করা বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টাদের একটি ফোরাম এ বিষয়ে মার্চের শুরুতে কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, করোনা ভাইরাসের নতুন এবং অতি সংক্রামক ভ্যারিয়েন্টের বিস্তার ঘটছে ভারতে। বিজ্ঞানীদের ওই ফোরামের অংশীদার ৫ জন বিজ্ঞানী এ কথা বলেছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে। ওদিকে ২৪ ঘন্টায় ভারতে করোনা সংক্রমণে নতুন বিশ্বরেকর্ড করেছে। এই সংখ্যা এখন ৪ লাখ ১ হাজার ৯৯৩। বিজ্ঞানীদের ওই গ্রুপের চারজন বলেছেন, তাদের দেয়া সতর্কতা সত্ত্বেও ভাইরাসের বিস্তার বন্ধে কঠোর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি সরকার। মাস্ক ছাড়াই লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এবং রাজনৈতিক র‌্যালিতে যোগ দিয়েছেন।

এসব র‌্যালিতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা এবং বিরোধী দলীয় রাজনীতিকরা। এখানেই শেষ নয়, প্রধানমন্ত্রী মোদির কৃষিনীতি পরিবর্তনের প্রতিবাদে দিল্লিতে অব্যাহতভাবে বিক্ষোভ করেন কয়েক লাখ কৃষক। তারা সেখানে ক্যাম্প করে অবস্থান করতে থাকেন।

উল্লেখ, বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ ভারত বর্তমানে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। গত বছর প্রথম দফার চেয়ে এবারের সংক্রমণের ভয়াবহতা অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতটা বিস্তার হয়েছে নতুন ভ্যারিয়েন্টের জন্য। আরেকটি ভ্যারিয়েন্ট প্রথম শনাক্ত হয়েছিল বৃটেনে। আনন্দবাজার পত্রিকা গ্রুপের টেলিভিশন চ্যানেল এবিপি, টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারতে এরই মধ্যে একদিনে নতুন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এটা একদিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণের বিশ্বরেকর্ড। ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতায় আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তারপর ভারত যেসব বড় সঙ্কট মোকাবিলা করেছে তার মধ্যে করোনা ভাইরাসের এই ত্বরিত সংক্রমণ সবচেয়ে বড় সঙ্কট। এখন দেখার ব্যাপার হলো, এই সংক্রমণ মোকাবিলা মোদি এবং তার রাজনৈতিক দলকে কিভাবে প্রভাবিত করে। আগামী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৪ সালে। সেই নির্বাচনে সরকারের এ ভূমিকা কতখানি প্রভাব ফেলবে তা সময়ই বলে দেবে।

রয়টার্স লিখেছে, ভারত সরকার করোনা বিষয়ে বিজ্ঞানীদের যে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে তার নাম ‘ইন্ডিয়ান সার্স-কোভ-২ জেনেটিকস কনসোর্টিয়াম’ (আইএনএসএসিওজি- বা ইনসাকগ)। এই কমিটি মার্চের শুরুতে সরকারকে সতর্ক করেছিল। এসব বিজ্ঞানী ভারতের এমন একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে এই বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করেন। এ তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীদের এই গ্রুপের একজন সদস্য। তিনি ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় একটি গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক। কিন্তু ইনসাকগের ওই সতর্কতা প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে পৌঁছানো হয়েছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে মন্তব্য চেয়ে হতাশ হয়েছে রয়টার্স।

বিশেষত করোনা ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টের জিনোম শনাক্ত করার জন্য গত ডিসেম্বরে সরকার গঠন করে ইনসাকগ। এক্ষেত্রে তারা সতর্কতা দেয়ার ক্ষেত্রে ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে গবেষণা করার সক্ষমতা আছে জাতীয় এমন ১০টি গবেষণা কেন্দ্রকে একত্রিত করে তাদের গবেষণা পরিচালনা করে। ইনসাকগের সদস্য ও রাষ্ট্র পরিচালিত ইনস্টিটিউট অব লাইফ সায়েন্সের পরিচালক অজয় পারিদা বলেছেন, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে প্রথম ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বি.১.৬১৭ শনাক্ত করেন ইনসাকগের গবেষকরা। ১০ই মার্চের আগেই গবেষণায় প্রাপ্ত এসব তথ্য ইনসাকগ শেয়ার করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (এনসিডিসি) সঙ্গে। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় একটি গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক নাম প্রকাশ না করে জানান, তারা এনসিডিসিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এই সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন অংশে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এরপর এই গবেষণালব্ধ তথ্য শেয়ার করা হয় ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। এ নিয়ে রয়টার্স মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করলে তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

ওই সময়েই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি মিডিয়া ব্রিফিংয়ের খসড়া প্রস্তুত শুরু করে ইনসাকগ। ওই খসড়ায় তারা গবেষণালব্ধ তথ্য শেয়ার করেন। তাতে বলা হয়েছে, ভারতীয় করোনা ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টের দুটি উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে। প্রোটিন স্পাইকের পরিবর্তন করেছে এই ভাইরাস। ভারতে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপভাবে আক্রান্ত রাজ্য মহারাষ্ট্রের শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ নমুনায় এমনটা দেখা গেছে। এই খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, এই দুটি রূপান্তরের নাম দেয়া হয়েছে ই৪৮৪কিউ এবং এল৪৫২আর। এই দুটি রূপান্তর অত্যন্ত উদ্বেগজনক (আই কনসার্ন)। এতে আরো বলা হয়-‘(পরীক্ষালব্ধ) ডাটা বলছে, ই৪৮৪কিউ ভ্যারিয়েন্ট এন্টিবডিকে নিষ্ক্রিয় করে উচ্চ হারে আক্রমণ করে। ডাটা আরো বলছে এল৪৫২আর রূপান্তরিত করোনা ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে পারে। সহজ করে বললে, এই ভ্যারিয়েন্ট দুটি খুব সহজেই মানবকোষে প্রবেশ করতে পারে এবং মানুষের দেহে যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে তাকে আক্রমণ করতে পারে।

ইনসাকগ ১০ই মার্চ এসব বিষয়ে অবহিত করলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করে প্রায় দু’সপ্তাহ পরে ২৪ শে মার্চ। তবে মিডিয়ার কাছে দেয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এই ভাইরাস সম্পর্কে ইনসাকগের ব্যবহৃত ইংরেজি দুটি শব্দ ‘হাই কনসার্ন’ বা উচ্চ মাত্রায় উদ্বেগের ব্যবহার করেনি। মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে শুধু এটা বলেছে যে, এই ভ্যারিয়েন্টগুলো খুবই সমস্যাবহুল। এ জন্য যেসব ব্যবস্থা এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে। বাড়াতে বলা হয় পরীক্ষা এবং কোয়ারেন্টিন। তারপর থেকে পরীক্ষা দিনে দ্বিগুণ বাড়িয়ে করা হয় ১৯ লাখ।

বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার পরে সরকার কেন জোর দিয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়নি? এমন প্রশ্নের জবাবে ইনসাকগের চেয়ার শাজিদ জামিল বলেছেন, সরকার যেহেতু তার নীতি গঠন করেছে, তাই কর্তৃপক্ষ তাদের এসব তথ্যপ্রমাণের বিষয়ে যথেষ্ট নজর দেয়নি বলে তিনি অবহিত ছিলেন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, নীতি হতে হয় প্রমাণনির্ভর। অন্য কোনোভাবে নয়। কিন্তু এসব নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে আমলে নেয়া হয়নি বলে আমি উদ্বিগ্ন। আমি এটাও জানি, আমার এখতিয়ার কোন পর্যন্ত। বিজ্ঞানীরা তথ্যপ্রমাণ সরবরাহ করেন। নীতিপ্রণয়ন করার দায়িত্ব হলো সরকারের।

SHARE