প্রয়াণে ফাগুন: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

আইয়ুব আকন্দ বিদ্যুৎ

আমি সাংবাদিক নই। সাংবাদিকতার নিয়ম কানুন, রীতি পদ্ধতি সম্পর্কে কোন জ্ঞান বা ধারণা আমার নেই। তবে সাংবাদিক যে একটি রাষ্ট্রের পঞ্চম স্তম্ভ শুধু এই চেতনাটুকু আছে। একটি রাষ্টের সুষ্ঠু বিকােশ, অার্থ সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্প সাহিত্য বিকাশে ও জনজীবন মানের ক্রমোন্নতিতে সরকার,বিরোধী দল, সামরিক বাহিনী, সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকের ভূমিকা অগ্রগণ্য।সে হিসেবে একজন সাংবাদিক রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানার্হ ব্যক্তি। তবে সাংবাদিকতা যদি বিশেষ গোষ্ঠীর খয়ের খাঁ ও তল্পিবাহক না হয় এবং যদি হলুদ সাংবাদিক না হয় সেই সাংবাদিকই কেবল একটি রাষ্ট্রের সম্পদ বলে পরিগণিত হতে পারে। আমরা এখানে সেই ধরণের শ্রদ্ধার্হ সাংবাদিকতার কথা বলতে চেয়েছি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের মর্যাদা,নিরাপত্তা যে এখনও প্রতিষ্ঠিত নয় সে কথা বলাই বাহুল্য। যদিও বর্তমান সরকার, শেখ হাসিনার সরকার অনেকাংশে তুলনামূলকভাবে সাংবাদিক বান্ধব সরকার,তবুও এ সমাজে সাংবাদিকরা নিরাপদ নয়, শঙ্কামুক্ত নয়। সরকার কোন সাংবাদিককে মত প্রকাশে বাঁধা দিচ্ছে না, মামলা হামলা জেল জুলুমে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে না,তবুও এদেশে সাংবাদিককে এক উৎকণ্ঠিত সময় কাটাতে হয়, অপমান অপদস্থ হতে হয়, এমন কি সত্য প্রকাশে দৃঢ় প্রত্যয় সাংবাদিককে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। সাম্প্রতিক কালে শেরপুরের প্রথিতযশা সাংবাদিক, শেরপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কবি ও সাংবাদিক কাকন রেজার পুত্র উদীয়মান সাংবাদিক ফাগুন রেজার হত্যাকাণ্ড আমাদের এই উৎকণ্ঠার কারণ।

ফাগুন রেজা প্রিয় ডটকম নামক নিউজ পোর্টালের একজন তরুণ, মেধাবী ও সম্ভাবনাময় সহ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিবিএ প্রফেশনালের ছাত্রাবস্থায় এই সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ করেছেন মূলত তাঁর মধ্যে বংশ পরম্পরায় সাংবাদিকতার বীজমন্ত্র উপ্ত ছিল বলে। তাঁর পিতা কাকন রেজা একজন সাংবাদিক, যিনি সাপ্তাহিক শেরপুর পত্রিকার সম্পাদক। এবং তিনি একজন কবিও। ফাগুনের দাদা আব্দুর রেজ্জাক কবি এবং সাপ্তাহিক শেরপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক, সম্পাদক। এমন কি আব্দুর রেজ্জাক সাহেবের পিতাও সাহিত্য সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিকতার এই পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে বেড়ে ওঠার কারণেই শিক্ষা জীবন শেষ করার আগেই ফাগুন রেজা সাংবাদিকতায় নিজেকে জড়িয়েছিলেন। তিনি শুধু জড়িয়ে ছিলেন না, ইতোমধ্যে সাংবাদিকতায় পরিছন্নতা, পরিপক্বতায় তিনি তাঁর পিতা কিংবা দাদাকে ছাড়িয়ে এক অনন্য আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি শেরপুরের প্রতিক হয়ে ঢাকার সাংবাদিকতায় শনৈ শনৈ আলো ছড়াচ্ছিলেন বটে। ইংরেজিতে রিপোর্ট লেখায় তাঁর সমকক্ষ তার বয়সে আর কেউ আছেন বলে আমার জানা নেই। এহেন অতি মর্যাদাবান একজন সাংবাদিককে দুর্বৃত্তের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে অকালে চলে যেতে হবে একথা মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু বাস্তবতা এতই নির্মম যে আমাদের শেরপুরের সাংবাদিক জগতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এক নক্ষত্রকে কিনা লাশ হয়ে অবহেলায় পড়ে থাকতে হলো জামালপুরের অনতি দূরে নান্দিনার কাছে রেল লাইনের পাশে। তিনি ট্রেন যোগে ঢাকা থেকে শেরপুরে ফিরছিলেন। কিন্তু ফিরে এলেন এক নাটকীয় পরিসমাপ্তি শেষে লাশ হয়ে। কে বা কারা তাকে ওখানে ওভাবে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলে গেল, কী উদ্দেশ্য হত্যা করলো কিছুই জানা গেল না। একজন সাংবাদিক যিনি দেশের জন্য মনন ও মেধায়, শ্রম ও ঘামে নিরলস সেবা করেন, যিনি সত্যের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখতে জীবন বাজী রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন,যিনি রাষ্ট্রের পঞ্চম স্তম্ভের একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি তাঁর শেষ প্রয়ান কি এতই বেদনার্হ হওয়ার কথা! কিন্তু কেন ফাগুন রাষ্ট্রের কাছে একটি নিরাপদ জীবন পেলেন না, কেন তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিয়ে বাঁচতে পারলেন না,প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা এ অপমৃত্য মেনে নেব কীভাবে? আমরা কীভাবে এ দহন সইবো,কীভাবে এ লাশ বহন করবো কাঁধে। এ লাশ যে রাষ্ট্রের কাছে এক বিরাট ভার বোঝা। এ লাশ বাংলাদেশের মাটিকে আঁকড়ে ধরে আছে সর্বশক্তি দিয়ে, তাঁকে আমরা সকলে মিলে উত্তোলিত করে কবরস্থ করতে পারছি না। এ লাশ থাকতে চায় না কবরে,কেবলি উঠে আসতে চায় আমার সবুজ শ্যামল বাংলার মমতাঘেরা নীড়ে, বাঁচতে চায় এ দেশের জল মাটি আলো বাতাস গায়ে মেখে। তাই ফাগুন আমাদের চোখের তারায় দৈরথ হয়ে আমাদের ঘুম কেড়ে নেন। আমরা ঘুমোতে পারি না।

ফাগুনের পিতা আজ শোকে মুহ্যমান। তিনি স্তম্ভিত, নির্বাক। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি বাকরুদ্ধ, হতভম্ভ।
তাঁর চিন্তা ও চেতনা যেন আজ মুঢ়। তিনি কাঁদতে ভুলে গেছেন। হয়তো কাঁদলেও আমরা সন্তান হারার এ বেদনা হৃদয়ে উপলব্ধি করতে পারছি না। তাছাড়া তিনি তো শুধু একজন পুত্রই হারান নি হারিয়েছেন নিজের হাতে, নিজের আদর্শে গড়া একজন সাংবাদিক বন্ধুকেও। এ উভয় দিকের শূন্যতা আজ তাঁর মধ্যে সৃষ্টি করেছে বিরাট এক ক্ষত, যে ক্ষত এত সহজে শুকাবার তো নয়! আর এও সত্য যে একজন সাংবাদিকের হদয় নির্ভিক হয়। নির্ভিকের হৃদয় কাঁদলেও চোখ তো কখনো কাঁদতে পারে না। নির্ভিকের চোখের কান্না মানায় না। তাই তার ভেতরের দহন জ্বালা ভেতরেই গোমরে মরছে, আগ্নেয়গিরির লাভার মত বাহিরে উদগীরণ হচ্ছে না। কিন্তু বাহিরের দেখাই কেবল দর্শন নয়, অন্তরের দেখাই দর্শন। তাই অনুভবের চোখে আজ কাকন ভাইকে দেখছি, তিনি আজ কতটা যে বেদনার্হ, শোকার্ত,বিপর্যস্থ। তাঁর বিপন্ন হৃদয় আজ গোপনে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। এহেন মর্মছেড়া শোকের মাঝে আমরা তাঁকে কী সান্ত্বনা দেব! কী এমন অমীয় বাণী আছে যা তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনবে স্বাভাবিক জীবনে?তাছাড়া এতদিন দেশের মানুষের সেবা করে তিনি যে প্রতিদান পেলেন তাঁর সে প্রতিদানের যথার্থতার কী জবাব আমাদের জানা আছে? এখানে আমরা সবাই যেন বাকহীন, অজর অক্ষম। সুতরাং তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমাদের আর গত্যন্তর নেই।

কিন্তু ফাগুনের জন্য কি আমাদের করণীয় কিছু নেই? তাঁকে মৃত্যুর পরেও কি বাঁচিয়ে রাখার আমাদের কর্তব্য নেই? তাকে মৃত লাশ বানিয়ে রেল নাইনের পাশে ফেলে রাখা হলো। রেল পুলিশ তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধানে না গিয়ে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফনের প্রস্তুতি নিল। এটা কেমন কথা? পুলিশ পারে না এমন কাজ কি আছে? তবে তাঁর বেলায় কেন এই অবহেলা? প্রশ্ন তোলা মোটেই অযৌক্তিক নয়। সাংবাদিক বলে কথা- দল মতের উর্ধের একজন নাগরিক। তাঁর সম্পর্কে নির্মোহ দৃষ্টি দেওয়া কি রাষ্ট্রের যথাযথ দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তির কর্তব্য নয়। রেল পুলিশ এ বাহবাটি কেন নিতে পারলেন না?

আর তাছাড়া পুলিশের একারই বা কেন এ দায়িত্ব পালন করতে হয়? যারা তথ্যানুসন্ধানি সাংবাদিক, যারা ক্রাইম রিপোর্টার, লোমহর্ষক কাহিনীর পর্যন্ত মূলোৎপাটন করতে পারেন তারা কোথায়? তারা কি আজ বিবরে বিরাজ করছেন? তাদের চোখও কি আজ অন্ধ? ঘটনার পক্ষকালাধিক সময়ান্তে তারা কোন্ তথ্যটি তুলে আনতে পারলেন? বুঝি মোটা অঙ্কের অফার থাকলে দুর্দান্ত সাহসী ক্রাইম রিপোর্টার গা করতেন? অর্থগৃধনু, সার্থান্ধ সাংবাদিক কখনো সাংবাদিক নন,তারা সংবাদ পেশাজীবী। আমরা তাদেরকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখান করছি। তারা সাংবাদিকতা পেশার কপোলে কালো তিলক মাত্র। ছিঃ! এ বড় লজ্জা!

ফাগুনকে আমরা কীভাবে স্মরণ করলাম? তাঁর পরিবারের প্রতি আমরা কতটুকু সমবেদনা জানালাম? দু এক জায়গায় মানব বন্ধন করে ফটোসেশন করে পত্রিকার খবর হলাম , সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিলাম তাতেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? তাঁর প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আমরা সারা দেশে এ হত্যাকাণ্ডের সংবাদটাই পৌঁছাতে পারলাম না, দেশে বিদেশে তোলপাড় তুলতে পারলাম না। তাহলে ঐ এক শুকনো মানব বন্ধনই কি প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা? আমরা কি কোন সভা, পথ নাটক, সেমিনার, দেওয়াল লিখন, লিফলেট, মনুমেন্ট স্থাপন কোন কিছু করেছি? শেরপুরের সাংবাদিক পুরোধা ব্যক্তিদের কাছে আমাদের দাবি ফাগুনের জন্য আরেকটু কিছু করুন। মন থেকে করুন। অন্তত শেরপুরের মাটি থেকে এক ইঞ্চি জায়গায় তাকে স্মৃতি স্তম্ভে জাগ্রত করুন। কেননা, ফাগুন তো হতে পারতো সারা পৃথিবীকে অবাক করে দেওয়া স্পষ্টভাষী সংবাদ প্রবাদ পুরুষ খন্দকার আব্দুল হামিদ, হতে পারতো বিপ্লবী রবি নিয়োগী, যিনি বিপ্লব ও সংবাদ দুটোতেই অনন্য ছিলেন। তিনি হতে পারতেন ভুবন মোহনী কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মদন মোহন তর্কালঙ্কার কিংবা হাল আমলের অন্য কোন অনন্য ব্যক্তিত্বের উত্তরসুরী। এই অব-নমনের যুগে উচ্চ শিক্ষিত ফাগুন হতে পারতো মানিক মিয়া। আমরা তাকে এভাবে হেলায় এড়িয়ে যেতে পারি না।

আসুন আমরা নিয়মতান্ত্রিক বৃহত্তর আন্দোলন করি, আসাদের রক্তাক্ত শার্টকে আসুন আমরা আবারো প্রতীকি শক্তির অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করি। আসুন নূর হোসেনের মত ফাগুন দিবস পালন করি। আসুন ডা. মিলনের মত তাঁর জন্য মনুমেন্ট গড়ি। আসুন ফাগুনকে ভালোবেসে হাতে হাত ধরে রাজ পথে নামি। আসুন ফাগুনের হত্যাকারী খুঁজে বের করে রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিই। আসুন ভালোবাসি ভালোবাসা দিই। ফাগুনের আত্মা শান্তিতে থাকুক।

লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ।